প্রতিটি দেশেই হাসপাতালে মানুষ যায়, ভর্তি হয় নানা কারণে, চিকিৎসা নেয়, অনেকে ভালো হয়, হাসপাতাল ত্যাগ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিবছর তিন কোটি ৪০ লাখ মার্কিন হাসপাতাল ত্যাগ করে।
প্রধান যেসব কারণে হাসপাতালে থাকতে হয়, সেগুলোর মধ্যে প্রধান পাঁচটি হলো গর্ভসঞ্চার বা সন্তানপ্রসব, নিউমোনিয়া, হূদযন্ত্রবিকল, করোনারি হূদরোগ ও অস্টিও আর্থ্রাইটিস।
হাসপাতালে যোগ হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি
উন্নয়নশীল দেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারণ অন্য রকম হয়, যেমন সংক্রামক রোগ, যক্ষ্মা, ডায়রিয়া, পেটের অসুখ, ডায়াবেটিস জটিলতাসহ শ্বাসযন্ত্রের অসুখ। আছে বিশেষায়িত হাসপাতালও।
হাসপাতালের নথিপত্র সংরক্ষণের কাগজের ব্যবহার কমছে, হচ্ছে ডিজিটাল। ভুলত্রুটি কম হওয়ার জন্য ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ডের প্রচলন বাড়ছে, হাসপাতালের উপাত্ত সহজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। অনলাইন ব্যবস্থাপত্র লিখছেন চিকিৎসকেরা, টেস্ট ফলাফল চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে অনলাইনে, তাঁরা দেখছেন মেডিকেল ইমেজ। অনেক অতি আধুনিক হাসপাতালে শুরু হচ্ছে রোবটিক সার্জারি, সার্জনরা অন্য কক্ষ থেকে পরিচালনা করছেন রোবটদের। হিপ প্রতিস্থাপন, ডিম্ববাহীনালির সার্জারি, প্রোস্টেট অপসারণ, পিত্তনালি ও কিডনি সার্জারি এবং পাকস্থলী সার্জারিতে ব্যবহূত হয় রোবটিক সার্জারি। বদলে যাচ্ছে হাসপাতালের পরিবেশ। স্মার্ট ডিজাইন হচ্ছে নতুন দিনের প্রত্যাশা। কিছু কিছু ডিজাইন নতুন প্রযুক্তিকে ধারণ করার জন্য উপযোগী হচ্ছে। বায়ু বিশুদ্ধকরণ হয়েছে উন্নত, পানির সিংক বসানো হচ্ছে উপযুক্ত স্থানে, এতে কমছে সংক্রমণের ঝুঁকি। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিদ্রা ও রোগ থেকে সেরে ওঠা সুগম করছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। মৃদু সংগীত, রৌদ্রালোক ও প্রকৃতিদর্শন রোগীদের মনে আনছে আনন্দ, হাসপাতালবাস হয়ে উঠছে তাদের জন্য সুখকর।
হাসপাতাল হয়ে উঠছে পরিবারবান্ধব
অতিথি ও দর্শনপ্রার্থীর জন্য হাসপাতালকে সীমিত করার চল কমছে। পরিবারবান্ধব ডিজাইন ও নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে হাসপাতালে। নতুন দিনের হাসপাতালে পরিবারের সদস্যদের জন্য আরও কক্ষ বরাদ্দ করা হচ্ছে। রোগীকে আরও বেশি পরিবারের সদস্যদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
হাসপাতালে গড়ে উঠছে ঘরোয়া পরিবেশ
একসময় সন্তান প্রসবের পর সন্তানকে নার্সারিতে এবং মাকে অন্যত্র—এমন চল ছিল। পরবর্তী সময় হাসপাতাল থেকে মা ও সন্তান যেতেন গৃহে, সন্তান পেতেন বোতলের দুধ। পশ্চিমা দেশে তা-ই ছিল। অবশ্য প্রাচ্যের চিত্র ছিল অন্য রকম। মা ও সন্তানের বন্ধন ছিল অচ্ছেদ্য জন্ম থেকেই।
এখন সন্তান প্রসবকাল, প্রসব এবং প্রসব-উত্তর কাল কাটে একই স্থানে। মা ও নবজাতক থাকে একত্রে, গা স্পর্শ করে, সন্তান লালিত হয় মায়ের বুকের দুধ পান করে। প্রাচ্যের এই সংস্কৃতি এখন প্রতীচ্যেও চালু হয়েছে।
চিকিৎসা প্রদানে ত্রুটি প্রতিরোধ
সঠিক ওষুধ যাতে ঠিক রোগীর কাছে পৌঁছায়, এ জন্য ব্যবহূত হচ্ছে নানা প্রযুক্তি। কম্পিউটারাইজড মেডিকেশন নির্দেশ ব্যবহূত হচ্ছে, আরও অন্যান্য নিরাপত্তার উপায় যেমন বারকোড, অ্যালার্ট সিগন্যাল। হস্তলিখিত ব্যবস্থাপত্র বাদ দেওয়া হচ্ছে। আরও নিরাপত্তার জন্য কর্মী প্রশিক্ষণ, এসওপি, সিচুয়েশন অ্যাওয়ারনেস, চেকলিস্ট ও টাইম আউট পদ্ধতি ব্যবহূত হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটারে রয়েছে ‘সার্জিক্যাল সেফটি চেকলিস্ট’।
সংক্রমণ প্রতিরোধ
হাসপাতাল হলো আরোগ্য নিকেতন। তবুও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নানা সংক্রমণে মৃত্যু হয় অনেক রোগীর, প্রতিবছর। রক্তে ঘটে সংক্রমণ, সংক্রমণ ঘটে মূত্রপথে এবং অপারেশনস্থলে সংক্রমণ। তবে সঠিক তদারকি, নজরদারি, হাত ধোয়া, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির উন্নতিতে কমে আসছে হাসপাতালের সংক্রমণ।
রয়েছে বিশেষায়িত হাসপাতাল
বিশেষ বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার জন্য, যেমন হার্ট বা স্পাইন সার্জারির বিশেষায়িত হাসপাতাল। এ থেকে পাওয়া যায় সর্বাধুনিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা। কম খরচে গুণগতমানের চিকিৎসা সম্ভব হয় অনেক ক্ষেত্রে।
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস,
বারডেম হাসপাতাল, সাম্মানিক অধ্যাপক,
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো



0 comments:
Post a Comment